
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের বিতর্কিত প্রেসসচিব শফিকুল আলম ফোন করে ঢাকা পোস্টের সাবেক সম্পাদক মহিউদ্দিন সরকারের ‘চাকরি খাওয়ার’ হুমকি দিয়েছিলেন। এর কিছুদিন পর একটি সংবাদ প্রকাশের ঘটনায় তাকে তলব করা হয় তথ্য মন্ত্রণালয়ে।
ব্যক্তিগতভাবে ফোনে হত্যার হুমকিসহ সন্তানদের স্কুল থেকে তুলে নেওয়ার হুমকিও আসতে থাকে। শেষ পর্যন্ত চাকরি ছেড়ে লন্ডনে পরিবারসহ পাড়ি জমাতে বাধ্য হন প্রায় তিন দশকের অভিজ্ঞ এই সাংবাদিক।
বিশ্ব মুক্ত সংবাদমাধ্যম দিবসে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিজের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে সাংবাদিক মহিউদ্দিন সরকার ফেসবুকে একটি দীর্ঘ পোস্ট দিয়েছেন।
সাবেক প্রেসসচিব শফিকুল আলমের কাছ থেকে সরাসরি হুমকি পাওয়ার কথা জানিয়ে তিনি লেখেন, “দিন-তারিখ ঠিক মনে নেই। অফিস শেষে জিম করে প্রতিদিনকার মতো গুলশান-১-এর গ্লোরিয়া জিনস কফিশপে আড্ডা দিচ্ছিলাম। আনুমানিক সোয়া ১০টার দিকে হঠাৎ মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল। প্রেসসচিব শফিক ভাইয়ের ফোন। কী যেন একটা নিউজ নিয়ে কথা বললেন। বেশ উত্তেজিত মনে হলো। আমি স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে রাগ ভাঙানোর চেষ্টা করে বিষয়টা দেখছি বলে উনাকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু না; উনি মালিকের কাছে অভিযোগ, চাকরি খেয়ে দেওয়াসহ আরো কী কী যেন বললেন।”
বিষয়টিকে তখন অন্যরকম মনে হওয়ার কথা জানিয়ে মহিউদ্দিন সরকার লেখেন, “শফিক ভাইয়ের সঙ্গে জাগো নিউজ থেকে আমার সম্পর্ক ও পরিচয়। মাঝে মাঝে কথা হতো। কিন্তু সেদিনের বিষয়টা মেনে নিতে পারছিলাম না। মাঝে মাঝে সহকর্মীদের কাছ থেকে শুনতাম ড. ইউনূসের প্রেস উইং ঢাকা পোস্টের ব্যাপারে খুবই নেগেটিভ।”
তিনি আরও লেখেন, “প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সংবাদ সম্মেলন কাভার করতে কার্ড দেয়নি ঢাকা পোস্টকে। আটকে দিয়েছিলেন এসবি পাস। বিশেষ করে আমার ব্যাপারে সহকারী প্রেসসচিব নাকি বেশি নেগেটিভ ছিলেন।”
এর পরে আরো ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়ার তথ্য তুলে ধরেন সাংবাদিক মহিউদ্দিন সরকার। তিনি লেখেন, “এর পরের ঘটনাটা তো সবারই জানা। এনসিটিবির পাঠ্যপুস্তকে নিম্নমানের কাগজ ও আসিফ নজরুল এবং মাহফুজের নাম করে এক এনসিপি নেতার বেপরোয়া বাণিজ্যের নিউজ প্রকাশ হলো ঢাকা পোস্টে। সারা দেশে শুরু হলো তোলপাড় এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিষয়টা ভাইরাল হয়ে গেল। আমার ডাক পড়ল তথ্য মন্ত্রণালয়ে।”
তিনি আরো লেখেন, “আমাকে ব্যক্তিগতভাবে ফোনে হত্যার হুমকিসহ আমার ছেলেমেয়েদের স্কুল থেকে তুলে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হলো প্রকাশ্যে ফেসবুকে। অবস্থা বেগতিক দেখে রাতে উপদেষ্টার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ফোন করে আমার খবর নিলেন। বললেন, উপদেষ্টা নিজেও উদ্বিগ্ন আমার নিরাপত্তা নিয়ে।”
মহিউদ্দিন সরকার লেখেন, “দীর্ঘ ২৫ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে কখনোই কারো কোনো ক্ষতি করেছি মনে পড়ে না। পেশাগত কারণে হয়তো অনেকের সঙ্গে রূঢ় আচরণ করেছি বা চাকরিতে না বলেছি অনেককে। সেটা অবশ্যই প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে অথবা তার ক্যারিয়ারের কথা বিবেচনা করে।”
তিনি আরও বলেন, “এর মধ্যেই সহকর্মীদের কাছ থেকে শুনতে পেলাম ঢাকা পোস্টের সম্পাদক পদের জন্য কেউ কেউ চেষ্টা-তদবির করছিলেন। আমি নিজের চাকরি নিয়ে কখনোই উদ্বিগ্ন ছিলাম না। বিষয়টি নিয়ে আমার স্ত্রীর সঙ্গে আলাপ করলাম। সে-ও বেশ চিন্তায় পড়ে গেল। এর মধ্যেই বিভিন্ন মিডিয়া হাউস দখল/সম্পাদক বদল হতে লাগল। তারপর আর যা হওয়ার, তা-ই হলো। নিজে নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে চেষ্টা করলাম। শেষতক দেশ ছেড়ে দেওয়ার মতো সিদ্ধান্তই নিলাম।”
তিনি লেখেন, “গত বছর ঈদুল আজহার পরদিন সকালে সপরিবারে দেশ ছেড়ে চলে আসি। ওই দিন না হলে হয়তো আসতেই পারতাম না। দেশ ছেড়ে আসার পরও শুনলাম আরেকটি মামলার খবর। সেটাও বাড্ডা থানায়। মোটামুটি একই ধরনের মামলা।”
সর্বশেষে তিনি লেখেন, “আজ মুক্ত গণমাধ্যম দিবস। নিজের কিছু কষ্টের কথা শেয়ার করলাম বন্ধুদের সঙ্গে। সবাই আমাদের জন্য দোয়া করবেন। বাংলাদেশে বিএনপির নেতৃত্বে নতুন সরকারের সময়ে গণমাধ্যম ভালো থাকুক, ভালো থাকুক আমার পেশার মানুষজন।”
প্রসঙ্গত, ড. ইউনূসের শাসনামলে তার প্রেসসচিব শফিকুল আলম একাধিকবার দাবি করেন, দেশের সংবাদমাধ্যম ‘ইতিহাসের সর্বোচ্চ স্বাধীনতা’ ভোগ করছে।
খবরচিত্র.কম
মন্তব্য করুন