
বাংলাদেশ তিনটি ভূমিকম্পপ্রবণ টেকটোনিক প্লেটের (ইন্ডিয়ান, বার্মা ও ইউরেশিয়ান) সংযোগস্থলে অবস্থিত। তাই মাঝেমধ্যে ভূমিকম্প হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু সম্প্রতি দেশের অভ্যন্তরে, বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে (খুলনা-সাতক্ষীরা-যশোর অঞ্চল) ভূমিকম্পের উৎপত্তি ও কম্পনের প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এই অঞ্চলটি আগে ভূমিকম্পের কম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে বিবেচিত হলেও এখন পরিস্থিতি বদলাচ্ছে।
শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ১টা ৫২ মিনিটে সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলায় ৫.৪ মাত্রার মাঝারি ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়। এর কম্পন ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অনুভূত হয়। সাতক্ষীরায় আতঙ্কে মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসে। অনেকে জানান, বেশ শক্তিশালী ঝাঁকুনি অনুভব করেছেন।
আশাশুনি সদরের বাসিন্দা আবদুল আলী বলেন, “হঠাৎ দোতলা বাড়ি দুলে উঠল। পরিবারের সবাই দ্রুত নিচে নেমে আসে।”
সুন্দরবন-সংলগ্ন হরিনগর গ্রামের বাসিন্দা পূর্বপদ মল্লিক বলেন, “দুপুরের দিকে হঠাৎ ভূমিকম্পে আমার দোতলা বাড়িটি দুলে ওঠে।”
এটি একক ঘটনা নয়। গত কয়েক মাসে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ভূমিকম্পের উৎপত্তি বেড়েছে:
আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মধ্য ফেব্রুয়ারি থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরে ও সীমান্ত-সংলগ্ন এলাকায় ৩২টি ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি (১০টি) হয়েছে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে (ডাউকি চ্যুতির কাছাকাছি)।
ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আক্তারুল আহসান (যুক্তরাষ্ট্রের অবার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূমিকম্প নিয়ে পিএইচডি করছেন) বলেন, “সাতক্ষীরার ভূমিকম্পটি ২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর নরসিংদীতে হওয়া ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পের আফটার-শক হতে পারে। আমার গবেষণায় কলকাতা থেকে জামালপুর হয়ে ময়মনসিংহ পর্যন্ত ৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ নতুন একটি ফাটলরেখার (কলকাতা-জামালপুর-ময়মনসিংহ ফল্ট) সন্ধান পাওয়া গেছে। সাতক্ষীরা ও নরসিংদী এই ফাটলরেখার হিঞ্জ লাইনের (ফাটলরেখার উভয় পাশে ৩০ কিলোমিটার এলাকা) মধ্যে পড়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তের দুই প্লেটের বিপরীতমুখী টানের (টেনশনাল ফোর্স) মধ্যে পড়েছে। এ কারণে এই অঞ্চলে ভূমিকম্পপ্রবণতা বেড়ে গেছে। নতুন ফাটল সৃষ্টি হতে পারে অথবা পুরোনো ফাটল নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে।”
আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবাইয়াৎ কবীর বলেন, “২০১৬ সালের পর ১৩ মাসে দেশের অভ্যন্তরে ৩২টি ভূমিকম্পের উৎপত্তির রেকর্ড নেই। দেশের অভ্যন্তর ও সীমান্তবর্তী এলাকায় ভূমিকম্প বেড়ে যাওয়ার কারণ ভূ-অভ্যন্তরে বিপুল পরিমাণ শক্তি সঞ্চয় হয়েছে। এটি একটি বড় আকারের ভূমিকম্পের ইঙ্গিত দেয়, যেটা অনেক দিন ধরেই বলা হচ্ছে।”
অন্যদিকে ভূতাত্ত্বিক হুমায়ুন আখতার বলেন, “ওই এলাকায় বড় কোনো সক্রিয় টেকটোনিক প্লেট বাউন্ডারি নেই। তাই সেখানে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প হতে পারে, কিন্তু খুব বড় মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার আশঙ্কা কম।”
তিনি আরও বলেন, “আগের চেয়ে আমাদের দেশ এবং পার্শ্ববর্তী এলাকায় ভূমিকম্পের তথ্য সংগ্রহের তৎপরতা বেড়েছে। প্রযুক্তির উন্নয়ন হয়েছে। তাই হয়তো এখন আমরা বেশি এবং সঠিক মাত্রায় তথ্য পাচ্ছি।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এসব ভূমিকম্প ভীতিকর না হলেও দেশের ভেতরে ও আশপাশে ভূমিকম্পের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া বড় ভূমিকম্পের ইঙ্গিত দেয়। দেশে বড় ভূমিকম্প মোকাবিলার যথাযথ প্রস্তুতি এখনো অনেক ঘাটতি রয়েছে।
খবর চিত্র প্রতিবেদক
মন্তব্য করুন