Reporter
২৯ এপ্রিল ২০২৬, ৪:১১ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

মায়ের কথায় দেশে ফিরে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র বাঁচাতে গিয়ে ১০ মাসেই হার মানলেন ডা. গিয়াস উদ্দিন

চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাস করে বিদেশে পাড়ি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন ডা. গিয়াস উদ্দিন আহমেদ। তখন তার মা বলেছিলেন, “বাবা, এই গরিব দেশের মানুষের টাকায় তুই লেখাপড়া করে ডাক্তার হলি; এখন দেশ ছেড়ে চলে যাবি? যদি কখনো মনে হয়, দেশকে সেটা ফেরত দিবি, তাহলে দেশে ফিরে গরিব মানুষের সেবা করিস।”

অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে হিসাব কষে দেখেন, ডাক্তার হতে বাংলাদেশ তার পেছনে যে খরচ করেছে, সেটা বন্ড হিসেবে রাখা হলে দেশে ফেরার সময় তার মূল্য ১০ কোটি টাকারও বেশি হতো। তাই মনে হয়েছিল, দেশের প্রতি তার একটা দায় আছে।

মায়ের পরামর্শ মানতে দীর্ঘ ৩৩ বছর পর তিনি দেশে ফিরে গরিবের চিকিৎসা করতে যোগ দেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর সঙ্গে। কিন্তু তখন জীবন্ত কিংবদন্তি ডা. জাফরুল্লাহ মৃত্যুশয্যায়। সেই সুযোগে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে চলছিল লুটপাট, অরাজকতা ও দুর্নীতি। প্রতিষ্ঠানটিকে বাঁচাতে দুর্নীতিবাজ চক্রের সঙ্গে লড়াইয়ে নামেন ডা. গিয়াস। কিন্তু কুলিয়ে উঠতে না পেরে মাত্র ১০ মাসের মাথায় আবার দেশ ছাড়তে বাধ্য হন তিনি।

চরম আশাহত এই দেশপ্রেমিক চিকিৎসক এখন আছেন আর্জেন্টিনার এক প্রত্যন্ত এলাকায়, যেখানে চলাচলের একমাত্র মাধ্যম নৌকা। আধুনিক নাগরিক জীবনের কোলাহল থেকে বহুদূরে সেখানে এক ধরনের যাযাবর জীবন কাটাচ্ছেন এই বাংলাদেশি ইউরোলজিস্ট। গত ২৫ এপ্রিল রাতে কালের কণ্ঠের সঙ্গে দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে তিনি বিস্তারিত তুলে ধরেছেন তার সংগ্রাম ও স্বপ্নভঙ্গের বেদনাবিধুর গল্প।

ছাত্রজীবন থেকে দেশপ্রেম

চট্টগ্রামের সন্তান ডা. গিয়াস উদ্দিন আহমেদ পড়াশোনা করেছেন সেন্ট প্লাসিডস, মুসলিম হাই স্কুল, ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ ও চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে। ১৯৮৯ সালে ইন্টার্নশিপ শেষে তিনি দেশ ছাড়েন। আফ্রিকা হয়ে পরে অস্ট্রেলিয়ায় চিকিৎসা পেশায় স্থিত হন।

দীর্ঘ প্রবাসজীবনের পর মায়ের একটি কথা তাকে দেশে ফেরার সিদ্ধান্তে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। ২০২২ সালের নভেম্বরে তিনি দেশে ফেরেন। লক্ষ্য ছিল গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের হাসপাতালকে নতুন করে দাঁড় করানো, গরিব রোগী ও কর্মচারীদের পাশে থাকা।

ফিরে এসে যা দেখলেন

কিন্তু এসে দেখতে পান হাসপাতালের ভেতরে চরম অব্যবস্থাপনা, আর্থিক অনিয়ম, কর্মচারীদের বেতন বকেয়া, দাতা সংস্থার অর্থের অপব্যবহার এবং একটি প্রভাবশালী দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য। তাঁর ভাষায়, “দেশের জন্য কিছু করতে চেয়েছিলাম; কিন্তু গিয়ে দেখি, প্রতিষ্ঠানটি ঘুণে ধরা।”

হাসপাতালে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ছিল না, চিকিৎসা সরঞ্জাম ছিল অপ্রতুল। সিনিয়র চিকিৎসক ও কর্মকর্তাদের মধ্যে ফাঁকিবাজি ছিল প্রবল। তাঁকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দেয় ছোট পদের কর্মচারীদের অবস্থা। অনেকেই তিন-চার মাস বেতন পাননি।

ডা. গিয়াস বলেন, “যাঁদের বেতন নেই, তাঁদের কাজের প্রতি মোটিভেশন থাকবে কিভাবে? আমি ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে বেতন সচল করার পরিকল্পনা করি। এই হাসপাতালে গরিব রোগীদের একেবারে ফ্রি চিকিৎসার ব্যবস্থা করার কথাও ভাবি।”

দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের সঙ্গে লড়াই

এই উদ্যোগ থেকেই শুরু হয় দ্বন্দ্ব। ডা. গিয়াসের অভিযোগ, সিনিয়র নির্বাহী কর্মকর্তাদের একটি অংশ কর্মচারীদের বেতন, রোগীর সেবা বা হাসপাতালের উন্নয়ন নিয়ে আগ্রহী ছিল না; বরং তারা নিজেদের সুবিধা ও আর্থিক স্বার্থ রক্ষায়ই ব্যস্ত ছিল। ছোট ছোট উপকেন্দ্রের নামে অস্বচ্ছ খরচ দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করা হতো। বিদেশি দাতা সংস্থার অনুদান নিয়েও ব্যাপক অনিয়ম ছিল।

ট্রাস্টি বোর্ডের কিছু সদস্যের অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় তিনি তাদের চক্ষুশূলে পরিণত হন। তাঁর অভিযোগ, অডিট হতো কিন্তু কাগজপত্রে ছিল দুই নম্বরি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের আড়াই কোটি টাকার হিসাব দিতে হবে—এমন পরিস্থিতিতে কয়েক দিনের মধ্যেই ভুয়া হিসাব বানিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

তিনি আরও দাবি করেন, করোনার সময় আইসিইউ সরঞ্জামের জন্য দেওয়া ৫০ লাখ টাকা অনুদানের জিনিসপত্রও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হয়নি। অনেক সরঞ্জাম মেডিক্যাল কলেজের এক কোনায় পড়ে ছিল।

সিন্ডিকেটের ক্ষমতার কাছে তিনি ছিলেন অসহায়। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মৃত্যুর পর সেই সিন্ডিকেট আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত তার অফিসে প্রায় ৪০ জন গুণ্ডা ঢুকে পড়ে। এরপর আর সেখানে থাকা সম্ভব হয়নি। যোগদানের মাত্র ১০ মাসের মাথায় ২০২৩ সালের আগস্টে তাঁকে সরে যেতে হয়।

স্বপ্ন যা ভেঙে গেল

ডা. গিয়াসের বড় স্বপ্ন ছিল প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা চালু করা। উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস আগেভাগে শনাক্ত করে কিডনি ফেইলিউর, হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমানোর পরিকল্পনা ছিল। উপকেন্দ্রগুলোর মাধ্যমে ৩০-৪০ বছর বয়সীদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণের আওতায় আনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেই পরিকল্পনাও বাস্তবায়িত হয়নি।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশে অনেক তরুণ রোগী কিডনি ফেইলিউর নিয়ে আসে। অথচ পাঁচ-দশ বছর আগে রোগটা ধরা পড়লে সস্তা ওষুধেই হয়তো জীবন বদলে যেত। এই কাজগুলো করার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু পারলাম না।”

বর্তমান জীবন

ডা. গিয়াস উদ্দিন বর্তমানে আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস এইরেসের বাইরে এক নির্জন এলাকায় থাকেন। বাজার করতে নৌকায় যেতে হয়, অনেক সময় সপ্তাহখানেক মানুষের সঙ্গে দেখাও হয় না। তিনি এখন নিজের জীবনী লিখছেন।

বাংলাদেশে ফেরার কোনো ইচ্ছা আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “বাংলাদেশে আর ফেরার ইচ্ছা নেই। অনেক বড় ধাক্কা খেয়েছি। তবে একটা তৃপ্তি আছে—আমি চেষ্টা করেছি। সারা জীবন আক্ষেপ থাকত যে চেষ্টা করিনি। চেষ্টা করেছি, কিন্তু পরিবেশটা অনুকূলে ছিল না।”

খবরচিত্র.কম

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সীতাকুণ্ডে যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে সন্ত্রাসীদের হামলা, দুই ঘণ্টা গোলাগুলি

সৌদির সঙ্গে মিল রেখে জামালপুরে ঈদুল আজহা: ২০ গ্রামে হাজারো মানুষের আনন্দ

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র ঐতিহাসিক জ্বালানি চুক্তি: এলএনজি-এলপিজি আমদানিতে নতুন দিগন্ত

পাকিস্তানে আত্মঘাতী হামলায় দুই বাংলাদেশি প্রবাসীসহ ৯ নিহত

এনসিপি চট্টগ্রাম মহানগর আহ্বায়ক কমিটি থেকে ২২ নেতা একযোগে পদত্যাগ

ভারত-আমিরাতে চুক্তি: প্রতিরক্ষা, জ্বালানি নিরাপত্তা ও ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ

হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে নীরবতার অভিযোগ মিথ্যা: ডা. তাসনিম জারা

আওয়ামী লীগের ১৫ বছরে ৮ হাজার ৬২ কোটি ডলার বিদেশি ঋণ: মোট ঋণের ৭৮% একাই নিয়েছে দলটি

বিদেশি ভিসায় ব্যাংক স্টেটমেন্ট যাচাই এখন মুহূর্তে: বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা

ইউনূস সরকারের টিকার ঘাটতিতে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সতর্কবার্তা

১০

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি বিএনপি-জামায়াতের মতামত নিয়েই হয়েছে: ফরিদা আখতার

১১

মুসলিমদের ওপর অত্যাচার করলে ইতিহাসে দৃষ্টান্ত স্থাপন করব: তামিলনাড়ুর নতুন মুখ্যমন্ত্রী থালাপতি বিজয়

১২

মোটরসাইকেলে নতুন অগ্রিম আয়কর: ১১০ সিসি ফ্রি, বড় সিসিতে ১০ হাজার টাকা

১৩

লেবাননে ইসরাইলি ড্রোন হামলায় দুই বাংলাদেশি প্রবাসী নিহত

১৪

বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশ: ব্যাংকে না গিয়েই ঘরে বসে পাবেন ই-লোন

১৫

আওয়ামী লীগ তার পজিশনে ফিরবে, কিন্তু শেখ হাসিনার পথে গেলে আবার ডুববে: কাদের সিদ্দিকী

১৬

ঢাবির সহকারী প্রক্টর পদ থেকে পদত্যাগ করলেন অধ্যাপক শেহরীন আমিন ভূঁইয়া (মোনামি)

১৭

মিরপুর থানার মামলায় সাবেক এমপি সুমনের জামিন বহাল

১৮

ছাত্রলীগের তৎপরতা রাজনীতির সমীকরণ বদলে দেবে: গোলাম মাওলা রনি

১৯

জামালপুরে ৭৬ লাখ টাকার চেক জালিয়াতি: জামায়াতের সাবেক নেতা হারুনুর রশীদ গ্রেপ্তার

২০