Reporter
১৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ৫:০৯ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

নবনির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশের মানুষ দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নানা সীমাবদ্ধতা ও ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও, একটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, শান্তি ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নির্ধারণের জন্য নির্বাচনের গুরুত্ব অপরিসীম। এবারের নির্বাচনের ফলে একদল নতুন জনপ্রতিনিধির ওপর রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুদায়িত্ব অর্পিত হতে যাচ্ছে।

নেতৃত্ব মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এক কঠিন পরীক্ষা ও গুরুত্বপূর্ণ আমানত। কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের আদেশ দেন, তোমরা আমানত তার হকদারের কাছে পৌঁছে দাও এবং যখন মানুষের মধ্যে বিচার করবে, তখন ন্যায়ের সঙ্গে বিচার করবে।” (সূরা নিসা: ৫৮)

একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও শান্তির মূল ভিত্তি হলো সর্বক্ষেত্রে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা। আমাদের দেশে উন্নয়নের সবচেয়ে বড় অন্তরায় দুর্নীতি ও সুশাসনের অভাব। নবনির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের প্রথম ও প্রধান কর্তব্য হওয়া উচিত—রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করা। ক্ষমতা যেন কোনো ব্যক্তি বা দলীয় স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার না হয়। বিশেষ করে সরকারি নিয়োগ, পদোন্নতি ও দায়িত্ব বণ্টনে দলীয় পরিচয় নয়—মেধা, যোগ্যতা ও সততাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। অযোগ্যকে যোগ্যের ওপর প্রাধান্য দেওয়া আমানতের খেয়ানত। রাসূল (সা.) সতর্ক করে বলেছেন: “যখন আমানত নষ্ট করা হবে, তখন কেয়ামতের অপেক্ষা করো।” সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আমানত কীভাবে নষ্ট হয়?” তিনি বললেন, “যখন অযোগ্য ব্যক্তিকে কোনো কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়।” (বুখারি)

জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অত্যন্ত জরুরি। ভিনদেশিরা সামান্য ঋণের বিনিময়ে আমাদের ওপর নানা অপ্রাসঙ্গিক ও আমাদের মূল্যবোধবিরোধী শর্ত আরোপ করে। আমাদের জনগোষ্ঠীর বিপুল অংশ তরুণ। তাদের দক্ষতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ ও উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। তবেই অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন সম্ভব।

নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। অসাধু সিন্ডিকেট, মজুদদারি ও চাঁদাবাজি রুখতে জনপ্রতিনিধিদের আপসহীন ভূমিকা পালন করতে হবে। রাসূল (সা.) বলেছেন: “যে ব্যক্তি বাজারে পণ্য মজুদ করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে, সে পাপিষ্ঠ।” (মুসলিম)

স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পার হলেও নিরাপদ খাদ্য, পানীয় ও ওষুধের নিশ্চয়তা এখনো দিতে পারেনি আমরা। ভেজাল খাদ্য ও ওষুধে দুরারোগ্য ব্যাধি দিনদিন বাড়ছে। মানুষের নিত্যদিনের ব্যয়ের বড় অংশ চলে যায় চিকিৎসার পেছনে। জনস্বাস্থ্যের নিরাপত্তায় নিরাপদ খাদ্য ও ওষুধ নিশ্চিত করা, চিকিৎসা ব্যবস্থাকে সুলভ ও সহজলভ্য করা—এগুলো জনপ্রতিনিধিদের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

ন্যায়বিচার রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বিচারব্যবস্থা নিশ্চিত করা ছাড়া সমাজে শান্তি আসবে না। ইসলামের ইতিহাসে ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় স্বজনপ্রীতির কোনো স্থান নেই। রাসূল (সা.) দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেছেন: “আল্লাহর কসম, যদি মুহাম্মদের মেয়ে ফাতিমাও চুরি করত, তবে আমি অবশ্যই তার হাত কেটে দিতাম।” (বুখারি)

একটি আদর্শ রাষ্ট্র তার নিজস্ব শিক্ষা ও সংস্কৃতির ধারক হয়। জাতীয় শিক্ষানীতি ও পাঠ্যক্রমে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের প্রতিফলন থাকতে হবে। ভিনদেশি ও তাদের এজেন্টদের আরোপিত বিজাতীয় অপসংস্কৃতি আমাদের শিক্ষা কারিকুলামে স্থান পাবে না। বাকস্বাধীনতা মানে অন্যের ধর্ম বা বিশ্বাসকে অবজ্ঞা করা নয়। জনপ্রতিনিধিদের এমন আইন ও পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠের বিশ্বাসকে শ্রদ্ধার চোখে দেখা হবে এবং প্রত্যেক নাগরিক নিজ নিজ ধর্ম পালন ও মতপ্রকাশের পূর্ণ অধিকার ভোগ করবে।

পরিশেষে নবনির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান—একজন মুসলিম হিসেবে আপনি মহান আল্লাহর বিধান দ্বারা শাসিত হবেন এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তা প্রতিফলিত করবেন। পূর্ণ আমানতদারি ও তাকওয়ার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবেন। কেয়ামতের দিন প্রতিটি দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে। নবী করিম (সা.) বলেছেন: “তোমাদের প্রত্যেকেই একেকজন রাখাল (দায়িত্বশীল) এবং প্রত্যেককেই তার অধীনদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।” (বুখারি)

জনপ্রতিনিধিরা যদি ক্ষমতাকে আমানত মনে করেন এবং নাগরিকরা নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হন, তবেই একটি সমৃদ্ধ, ন্যায়ভিত্তিক ও কল্যাণময় রাষ্ট্র গঠন সম্ভব—ইনশাআল্লাহ।

জুমার মিম্বর থেকে খবর চিত্র প্রতিবেদক

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সীতাকুণ্ডে যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে সন্ত্রাসীদের হামলা, দুই ঘণ্টা গোলাগুলি

১

সৌদির সঙ্গে মিল রেখে জামালপুরে ঈদুল আজহা: ২০ গ্রামে হাজারো মানুষের আনন্দ

২

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র ঐতিহাসিক জ্বালানি চুক্তি: এলএনজি-এলপিজি আমদানিতে নতুন দিগন্ত

৩

পাকিস্তানে আত্মঘাতী হামলায় দুই বাংলাদেশি প্রবাসীসহ ৯ নিহত

৪

এনসিপি চট্টগ্রাম মহানগর আহ্বায়ক কমিটি থেকে ২২ নেতা একযোগে পদত্যাগ

৫

ভারত-আমিরাতে চুক্তি: প্রতিরক্ষা, জ্বালানি নিরাপত্তা ও ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ

৬

হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে নীরবতার অভিযোগ মিথ্যা: ডা. তাসনিম জারা

৭

আওয়ামী লীগের ১৫ বছরে ৮ হাজার ৬২ কোটি ডলার বিদেশি ঋণ: মোট ঋণের ৭৮% একাই নিয়েছে দলটি

৮

বিদেশি ভিসায় ব্যাংক স্টেটমেন্ট যাচাই এখন মুহূর্তে: বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা

৯

ইউনূস সরকারের টিকার ঘাটতিতে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সতর্কবার্তা

১০

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি বিএনপি-জামায়াতের মতামত নিয়েই হয়েছে: ফরিদা আখতার

১১

মুসলিমদের ওপর অত্যাচার করলে ইতিহাসে দৃষ্টান্ত স্থাপন করব: তামিলনাড়ুর নতুন মুখ্যমন্ত্রী থালাপতি বিজয়

১২

মোটরসাইকেলে নতুন অগ্রিম আয়কর: ১১০ সিসি ফ্রি, বড় সিসিতে ১০ হাজার টাকা

১৩

লেবাননে ইসরাইলি ড্রোন হামলায় দুই বাংলাদেশি প্রবাসী নিহত

১৪

বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশ: ব্যাংকে না গিয়েই ঘরে বসে পাবেন ই-লোন

১৫

আওয়ামী লীগ তার পজিশনে ফিরবে, কিন্তু শেখ হাসিনার পথে গেলে আবার ডুববে: কাদের সিদ্দিকী

১৬

ঢাবির সহকারী প্রক্টর পদ থেকে পদত্যাগ করলেন অধ্যাপক শেহরীন আমিন ভূঁইয়া (মোনামি)

১৭

মিরপুর থানার মামলায় সাবেক এমপি সুমনের জামিন বহাল

১৮

ছাত্রলীগের তৎপরতা রাজনীতির সমীকরণ বদলে দেবে: গোলাম মাওলা রনি

১৯

জামালপুরে ৭৬ লাখ টাকার চেক জালিয়াতি: জামায়াতের সাবেক নেতা হারুনুর রশীদ গ্রেপ্তার

২০