
জাতীয় গবেষণা প্রতিবেদন: বাংলাদেশে মাদক ব্যবহারের অবস্থাভূমিকাবাংলাদেশে মাদক অপব্যবহার একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক সমস্যা হিসেবে উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। এই প্রতিবেদনটি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) এবং রিসার্চ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্টস লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত একটি জাতীয় পর্যায়ের গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করে। গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল দেশে মাদক ব্যবহারকারীদের সংখ্যা, ধরন, কারণ এবং সংশ্লিষ্ট সমস্যা নির্ণয় করা, যাতে নীতি প্রণয়ন ও প্রতিরোধ কার্যক্রমে সহায়তা করা যায়।।গবেষণাটি ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত পরিচালিত হয়েছে। এতে দেশের ৮টি বিভাগের ১৩টি জেলা এবং ২৬টি উপজেলা থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।গবেষণা পদ্ধতিনমুনা নির্বাচন: দেশব্যাপী প্রতিনিধিত্বমূলক নমুনা হিসেবে বিভাগীয় স্তরে স্তরীয়কৃত এবং ক্লাস্টার স্যাম্পলিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে ১৫ বছরের উর্ধ্বে ব্যক্তিদের থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।তথ্য সংগ্রহের উপায়: প্রশ্নপত্র-ভিত্তিক সাক্ষাৎকার, ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশন এবং কী ইনফর্মেন্ট ইন্টারভিউ।বিশ্লেষণ: পরিসংখ্যানিক সফটওয়্যার ব্যবহার করে তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যাতে জনসংখ্যার অনুপাত অনুসারে অনুমান করা যায়।সীমাবদ্ধতা: স্ব-প্রতিবেদিত তথ্যের কারণে কিছু অসঙ্গতি থাকতে পারে, তবে গোপনীয়তা নিশ্চিত করে তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানো হয়েছে।মূল ফলাফলমাদক ব্যবহারকারীদের সংখ্যা ও অনুপাতদেশে বর্তমানে আনুমানিক ৮২ লাখ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের অবৈধ মাদক ব্যবহার করছে, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪.৮৮ শতাংশ। এর মধ্যে:গাঁজা (ক্যানাবিস) সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক, ব্যবহারকারী প্রায় ৬১ লাখ (৬০,৭৯,৯১৪ জন)।ইয়াবা (মেথামফেটামিন): প্রায় ২৩ লাখ।অ্যালকোহল: প্রায় ২০ লাখ।কোডিনযুক্ত কাশির সিরাপ: প্রায় ১৫ লাখ।হেরোইন: প্রায় ৫ লাখ।ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারী: প্রায় ৩৯ হাজার।বিভাগীয় বিতরণসংখ্যার দিক থেকে সর্বাধিক: ঢাকা বিভাগ (প্রায় ২২.৯ লাখ)।অনুপাতের দিক থেকে সর্বোচ্চ: ময়মনসিংহ (৬.০২%), রংপুর (৬.০০%), চট্টগ্রাম (৫.৫০%)।সর্বনিম্ন: বরিশাল বিভাগ।বয়স এবং শুরুর কারণঅধিকাংশ ব্যবহারকারী তরুণ: ৩৩ শতাংশ ৮-১৭ বছর বয়সে এবং ৫৯ শতাংশ ১৮-২৫ বছর বয়সে প্রথম মাদক গ্রহণ শুরু করে।মূল কারণ: বন্ধুদের প্রভাব (সবচেয়ে বড় ভূমিকা), বেকারত্ব, পারিবারিক অস্থিরতা, মানসিক চাপ এবং সহজলভ্যতা (৯০ শতাংশ ব্যবহারকারী বলেছেন মাদক সহজেই পাওয়া যায়)।চিকিৎসা ও পুনর্বাসনমাত্র ১৩ শতাংশ মাদকসেবী চিকিৎসা বা পুনর্বাসনের সুযোগ পেয়েছেন।৬৯ শতাংশ চিকিৎসা সেবা এবং ৬২ শতাংশ কাউন্সেলিং চেয়েছেন।সেবাদানের অভাবে অনেকে মাদক ত্যাগে ব্যর্থ হচ্ছেন।সুপারিশমাদক সমস্যাকে জনস্বাস্থ্যভিত্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে মোকাবিলা করা, শুধু আইনশৃঙ্খলা নয়।পরিবার থেকে শুরু করে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা।পুনর্বাসন কেন্দ্র বাড়ানো (সরকার ইতিমধ্যে ৭ বিভাগে ২০০ শয্যা বিশিষ্ট কেন্দ্র চালুর অনুমোদন দিয়েছে)।গবেষণা ও নীতি প্রণয়নে রাজনৈতিক সংকল্প বাড়ানো।উপসংহারএই গবেষণা দেখিয়েছে যে মাদক অপব্যবহার বাংলাদেশের জন্য একটি দ্রুতবর্ধমান সংকট। বিশেষ করে গাঁজার ব্যাপক ব্যবহার (৬১ লাখ) উদ্বেগজনক। সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, যাতে তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করা যায়। প্রতিবেদনটি নীতিনির্ধারকদের জন্য মূল্যবান তথ্য সরবরাহ করবে।
মন্তব্য করুন