
উন্নয়ন প্রকল্পের নামে আওয়ামী লীগ সরকার সাড়ে ১৫ বছরে নতুন ঋণ নিয়েছে ৮ হাজার ৬২ কোটি ডলার। চড়া সুদ ছাড়াও ঋণের বড় অংশই ছিল কঠিন শর্তের জালে বন্দি। বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়বে আগামী অর্থবছরে। ইতোমধ্যে চলতি মার্চ পর্যন্ত পরিশোধ করা হয়েছে ৪০০ কোটি ডলার। আর স্বাধীনতার পর থেকে দেশের মোট বিদেশি ঋণের মধ্যে ৭৮ শতাংশই নিয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের মোট বিদেশি ঋণের স্থিতি ছিল ২০ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার। ওই সরকারের সময় ২০০৮ সালে তা বেড়ে হয় ২২ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলার। ওই পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ সরকার দায়িত্ব নেয়। এরপর ২০২৪ সালে দলটি ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে বিদেশি ঋণের স্থিতি বেড়ে দাঁড়ায় ১০৪ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন বা ১০ হাজার ৪৭৬ কোটি ডলারে। অন্তর্বর্তী সরকার ডলার-সংকট মেটাতে ঋণ নেয়। ফলে ২০২৫ সালে বিদেশি ঋণ বেড়ে ১১৩ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। অর্থাৎ দেশের মোট বিদেশি ঋণের ৭৯.৯২ শতাংশ নিয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার সময় ২০০৯ সালের শুরুতে ডলারের দাম ছিল ৬৯ টাকা। তবে ক্ষমতা ছাড়ার সময়ে ২০২৪ সালের আগস্টে দাম বেড়ে দাঁড়ায় ১২০ টাকা। এমনকি ব্যাংকে ১৩২ টাকা দরেও ডলার বিক্রি হয়েছে। একই সময়ের ব্যবধানে বেড়েছে বৈদেশিক ঋণের সুদের হারও।
২০০৯ সালের শুরুতে বৈদেশিক ঋণের সুদহার ছিল ৪ থেকে ৫ শতাংশ। কোনো কোনো খাতে আরো কম। এখন ঋণের সুদের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ থেকে ৯ শতাংশ। ২০২২ থেকে ২৪ সালে বৈশ্বিক মন্দার সময়ে এ হার আরও বেশি ছিল। চুক্তি অনুযায়ী মোট ঋণের মধ্যে ৭৫ শতাংশ ঋণের সুদ ও বিনিময় হারই বাজারভিত্তিক হবে। অর্থাৎ ঋণ যখন পরিশোধ করা হবে তখন বাজারে যে সুদহার ও ডলারের দাম যা থাকবে ওই হারে পরিশোধ করতে হবে। আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে ডলারের দাম বেড়েছে ৫১ টাকা। এতে সমান হারে টাকার মান কমেছে। ঋণের মেয়াদ বাড়ানোর ফলে নিয়মিত বাড়তি সুদের পাশাপাশি দণ্ড সুদ বা সার্ভিস চার্জ পরিশোধ করতে হচ্ছে।
প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, আলোচ্য সময়ে দেশের মানুষের মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণের পরিমাণও বেড়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ৬০৭ ডলারে। অথচ ২০০৯ সালের শুরুতে ছিল ১৬৯ ডলার। এ হিসাবে আলোচ্য সময়ে মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে ৪৩৮ ডলার। মাথাপিছু মোট বৈদেশিক ঋণের ৭০ দশমিক ৫১ শতাংশই আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বেড়েছে। বাকি ২৯ দশমিক ৪৯ শতাংশ বেড়েছে অন্যান্য সরকারের আমলে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে মাথাপিছু বিদেশি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৬৫৭ ডলারে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ-এর গবেষক হেলাল আহমেদ জনি কালের কণ্ঠকে বলেন, বৈদেশিক ঋণ নিয়ে সেগুলো উন্নয়ন খাতে ব্যয় করলে কিছুটা সুফল মিলত। কিন্তু ঋণের টাকার একটি অংশ বিদেশে পাচার করা হয়েছে। ফলে বিদেশি ঋণের টাকায় দেশে কিছুই করা হয়নি। বরং দেশ থেকে টাকা পাচার হওয়ায় দেশের দায় বেড়েছে। সাধারণত বৈদেশিক ঋণ নিয়ে তা যদি বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়-এমন সব প্রকল্পে ব্যয় করা হলে তাহলে পরিশোধের ক্ষেত্রে ঝুঁকি কম থাকে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যেসব ঋণ নেওয়া হয়েছে তার প্রায় সবই খরচ করা হয়েছে স্থানীয় মুদ্রা নির্ভর প্রকল্পে। ফলে দুভাবে ওইসব ঋণ অর্থনীতিতে ঝুঁকির সৃষ্টি করেছে।
এক. পাচার করে ও দুই. স্থানীয় অর্থ আয় নির্ভর প্রকল্পে ব্যয় করে। যে কারণে এখন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ঋণের বোঝা টানতে গিয়ে প্রত্যাশা অনুযায়ী রিজার্ভ বাড়ানো যাচ্ছে না। নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে অর্থনীতিতে। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে এ নেতিবাচক প্রভাব আরো বেড়েছে। যার সরাসরি দায় বহন করতে হচ্ছে দেশের মানুষকে।
খবরচিত্র.কম
মন্তব্য করুন